
রুমেল আহসান:: অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৫২ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের শাহজালাল সার কারখানার সাবেক প্রধান হিসাবরক্ষক ও হিসাব বিভাগীয় প্রধান খোন্দকার মো. ইকবাল। এ যেন দুর্নীতির ষোলকলা পূর্ণ করেছেন তিনি। পাঁচ বছরে অর্থ-আত্মসাতে তার সঙ্গী হয়েছেন কারখানার সাবেক রসায়নবিদ নেছার উদ্দিন ও স্ত্রী, শ্যালক ও ঘনিষ্টজন এবং অন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও। স্ত্রী হালিমা ও শ্যালক জামসেদের নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুলে বিভিন্ন প্রকল্প নাম মাত্র কাজ নিয়ে ইকবাল কারখানা থেকে লুট করেন কোটি কোটি টাকা। দুর্নীতির টাকা দিয়ে ইকবাল ঢাকায় গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। ইকবালের অবৈধ সম্পদ অর্জনের সহযোগী অন্যান্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অনেকের সন্ধান মিলছে না। কেউ কেউ দেশত্যাগ করেছেন।
ইকবাল ও তার স্ত্রী হালিমা আক্তার(৪০) কারাগারে আছেন। গত বছরের জুন মাসে ইকবাল ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে র্যাব। বর্তমানে ইকবাল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা মামলা তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির অনুসন্ধানে ইকবাল ও তার স্ত্রীর অপরাধমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। দ্রæত তদন্ত শেষ করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
জানা যায়, ইকবাল রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতেই ১১শ’ বর্গফুটের পাঁচটি ফ্ল্যাটের মালিক। খিলগাঁও এবং বাসাবোতে রয়েছে আরেকটি অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট। বনশ্রীতে রয়েছে তার আরও তিনটি ফ্ল্যাট। কাকরাইল ও মালিবাগে জমিসহ ভবনও কিনেছেন তিনি। দুটি ভবন ভাড়া দেওয়া, দুটিতে চালু আছে রেস্টুরেন্ট ও খাবার দোকান, চারটি চেইন সুপারশপ, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রেন্ট-এ কারের মাধ্যমে ইকবালের স্ত্রীর নামে থাকা ৯১টি গাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নিজ জেলা ফেনীর পরশুরাম উপজেলাসহ ফেনীতেও নামে-বেনামে অনেক সম্পদ রয়েছে।
সিলেটের দুদক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সাল থেকে ইকবাল সার কারখানার বিভিন্ন প্রকল্পের নামে টাকা আত্মসাতের ধান্ধা শুরু করেন। শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের অনুকূলে ঢাকার দিলকুশা জনতা ব্যাংক শাখার দুটি হিসাব থেকে অর্থ-আত্মসাৎ করেন ইকবাল। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভুয়া বিল-ভাউচার ও জালিয়াতির মাধ্যমে এ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া বিল ভাউচার ও কোনোটিতে বিল ভাউচার ছাড়াই ৭১টি চেকের মাধ্যমে ২০১৭ এবং ২০১৮ সালের বিভিন্ন তারিখে শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের অনুকূলে জনতা ব্যাংক লিমিটেড কর্পোরেট শাখা দিলকুশা, ঢাকায় পরিচালিত হিসাব নম্বর ০০০০০৩৯৩৩০০৯৫৯৮ ও ০০০০০৩৬০০১১৭২ থেকে উত্তোলন করা হয় ১৩ কোটি ৬৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫৬ টাকা। ইকবাল ও তার স্ত্রী হালিমা এবং শ্যালক জামসেদুর রহমান মিলে ১২ কোটি ৪৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩৩ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ইকবাল ও তার স্ত্রী হালিমা মিলে আত্মসাৎ করেছেন ১০ কোটি ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ১৮৬ টাকা। স্ত্রী হালিমা আক্তার মেসার্স নুসরাত ট্রেডার্স, মেসার্স টি আই ইন্টারন্যাশনাল ও ইউটোপিয়া প্রোপার্টিজ নামের তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিক। স্ত্রী হালিমা আক্তারের তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, ৮৬/৪ সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা। একই ঠিকানা খোন্দকার ইকবালেরও।
অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তথ্য পেয়েছে আত্মসাতকৃত অর্থে নামে ও বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সার কারখানার সাবেক সহকারী প্রধান হিসাবরক্ষক ইকবাল। এ ঘটনায় ওই চক্রের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে ইকবালের নেতৃত্বে চক্রটির বিরুদ্ধে ১৩ কোটি ৬৭ লাখ ৫ হাজার ৪৫৬ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ১১টি মামলা দায়ের করে দুদক। এর আগে, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট ইকবাল ও তার স্ত্রী হালিমা, শ্যালক জামসেদুর রহমানসহ ওই চক্রটির বিরুদ্ধে ৩৮ কোটি ৭১ লাখ ২৪ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় আরও ১৫টি মামলা দায়ের করেছিল দুদক। এর মধ্যে মোট ৫২ কোটি ৩৮ লাখ ৫ হাজার ৪৮০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন ইকবাল চক্র।
দুদকের দায়ের করা নতুন ১১টি মামলার এজাহারে দেখা যায়, দুদক তদন্ত নম্বর- ১/২২, মামলায় ইকবাল ও তার শ্যালক কুমিল্লার জামসেদুর দুটি চেকে পাঁচ লাখ ৮৭ হাজার ৫৫৮ টাকা আত্মসাৎ করেন। এছাড়া ২/২২ নম্বর মামলায় সার কারখানার সাবেক রসায়নবিদ নেছার উদ্দিন আহমদ ও ইকবাল মিলে আরও পাঁচটি চেকে তুলে নেন ৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৯১ টাকা। ৩/২২ নম্বর মামলায় ইকবাল ২১টি চেকে একাই ১ কোটি ৮৫ হাজার ৬৬২ টাকা আত্মসাৎ করেন। ৪/২২ নম্বর মামলায় সাবেক রসায়নবিদ নেছার উদ্দিন আহমদ ও ইকবাল ছয়টি চেকে ১৫ লাখ ৭০ হাজার ৭৫২ টাকা আত্মসাৎ করেন। ৫/২২ নম্বর মামলায় মেসার্স নুসরাত ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী স্ত্রী মোছা. হালিমা আক্তার ও তার স্বামী ইকবাল মিলে ১৮টি চেকে ৪ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার ৭৭০ টাকা আত্মসাৎ করেন। ৬/২২ নম্বর মামলায় ইকবালের স্ত্রীর মালিকানা টিআই ইন্টারন্যাশনালের নামে ছয়টি চেকে ৩ কোটি ৫ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৫ টাকা আত্মসাৎ করেন। ৭/২২ নম্বর মামলায় ইকবাল তার শ্যালক জামসেদুরের প্রতিষ্ঠানের নামে দুটি চেকে আরও ৬৬ লাখ ১৮ হাজার ৪৩৫ টাকা আত্মসাৎ করেন। ৮/২২ নম্বর মামলায় নোয়াখালীর হেলাল উদ্দিনের মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ দিয়ে চারটি চেকে ৯৫ লাখ ৮১ হাজার ৩২৭ টাকা আত্মসাৎ করে নেন। ৯/২২ নম্বর নিজের নামে একটি চেকে ২ লাখ ৬ হাজার ১৫০ টাকা আত্মসাৎ করেন ইকবাল। ১০/২২ নম্বর মামলায় স্ত্রীর মালিকানা আরেকটি ইউটোপিয়া প্রোপারটিজ দিয়ে চারটি চেকে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৬১ টাকা আত্মসাৎ এবং ১১ মামলায় ঢাকা মিরপুরের মাসুদ রানার মালিকানাধীন সানসাইন আইটি সল্যুউশন প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ইকবাল আরও দুটি চেকে চার লাখ ৮৬ হাজার ৪৯৫ টাকা আত্মসাৎ করেন।
গত বছরের দুদকের দায়ের করা মামলায় আরও অভিযুক্তরা হলেন- ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স নুসরাত ট্রেডার্স, মেসার্স রাফি এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. নুরুল হোসেন, ফালগুনী ট্রেডার্সের এমডি এএসএম ইসমাইল খান, মেসার্স আয়মান এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল হক, মেসার্স এন আহমদ অ্যান্ড সন্সের মালিক নাজির আহমদ (বচন), মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হেলাল উদ্দিন, মেসার্স সাকিব ট্রেডার্সের মালিক মো. আহসান উল্লাহ চৌধুরী।
দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় সিলেটের উপ-পরিচালক মো. নূর-ই-আলম বলেন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সার কারখানা সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের শাহজালাল ফার্টিলাইজারের প্রধান হিসাবরক্ষক ইকবাল, তার স্ত্রী হালিমা, শ্যালক জামসেদসহ চক্রটির দুদকের তদন্তে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ মিলেছে। তবে, ইকবালের অবৈধ সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। চক্রটির বিরুদ্ধে ৫২ কোটি টাকা আত্মসাতে মোট ২৬টি মামলা করেছিল দুদক।’
বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আ ন ম শরীফুল আলম বলেন, শাহজালাল সার কারখানায় বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ইকবালকে চার বছর আগে চাকুরিচ্যুত করে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ।