
রুমেল আহসান: ‘বাবু দুঃখের কথা কি কয়মু। আমার ছেলে-মেয়েরা স্কুলে গেলে তাদের হাতে ৫ টাকাও তুলে দিতে পারি না। তাদের কোনো ইচ্ছা (শখ) পূরণ করতে পারি না। ভালো জামা-কাপড় পড়তে দিতে পারি না। ছিঁড়ে যাওয়া কাপড় সেলাই করে গায়ে দিতে হয়। ১২০ টাকা দিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারছি না। এর মাঝে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানো দায়! দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে।’
আবেগ্লাপুত হয়ে এভাবে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের মণিপুর চা বাগানের শ্রমিক অজিত রিকমন। তিনি আরও বলেন, আমার এক মেয়ে কলেজে পড়ে, আরেক ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। টাকার অভাবে তাদের খাতা-কলম কিনে দিতে পারি না।
অজিতের মতো একইভাবে অসহায়ত্বের কথা বলছেন রমণী রিকমন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, দেশে সবকিছুর দাম বাড়ছে। কিন্তু আমাদের শ্রমের মূল্য বাড়ছে না। আমরা কি মানুষ না? আমাদের শ্রম কেন এত সস্তা। ৩০০ টাকা মজুরি না দিলে আমার চা বাগানে কাজ করতে যাব না। প্রয়োজনে না খেয়ে মরব। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে মণিপুর চা বাগানের শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। এভাবে প্রতিদিনই আন্দোলন করছেন তাঁরা।
দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে সারাদেশের ১৬৭ বাগানে ধর্মঘট পালন করছে চা শ্রমিকরা। ফেঞ্চুগঞ্জের মণিপুর, মোমিনছড়া ও ডালুছড়া চা বাগানের শ্রমিকরাও ধর্মঘট পালন করছেন। ১৬ দিন ধরে কাজে যাচ্ছেন না চা শ্রমিকরা। তিনটি বাগানে প্রায় আড়াই হাজার চা শ্রমিক কাজ করেন।
মোমিনছড়া চা বাগানের শ্রমিক কৃষ্ণ গোয়ালা বলেন, ‘আমি আয় করলে আমার পরিবারের ৬ জনের মুখে খাবার পড়ে। বাগানের সকল শ্রমিকের তো একই অবস্থা। ১২০ টাকা মজুরি পাই। এখনকার বাজারে কীভাবে চলে সংসার? নিজে খাই বা না খাই তিনটা সন্তান আর বুড়া মা-বাপকে তো খাবার দিতে হয়। বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম তাতে ১২০ টাকা কিভাবে আমরা সংসার চালাবো।’
ডালুছড়া চা বাগানের শ্রমিক মনিক গোয়ালা বলেন, আমরা তিনবেলা ভাতের সাথে লবণ, মরিচডলা ও চা পাতা খাই। কোনো কোনো সময় ভাত-লবণ খাই। আমরা না হয় কষ্ট করে খেয়ে বেঁচে আছি। কিন্তু বাচ্চাদের তো এই খাবার গলা দিয়ে পেটে নামে না। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকালে কান্না আসে। আমরা কি মানুষ না? আমরা কি আমাদের শ্রমের নায্য দাম পাবো না? আমরা কি কারো ওপর ভরসা রাখতে পারি না। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া অবধি কাজে যাব না।
কান্তিক গোয়ালা বলেন, ‘আমাগো রে মেশিনের মতো চালাচ্ছে। কিন্তু আমাগো কামের দাম বাড়ে না। আমাগো রে মনে হয় তাগো মানুষ মনে হয় না। বাপ-মা, বাচ্চা-কাচ্চা নিয়া আমাদের কষ্টের জীবন কাটাতে হয়। আয় করা তো দূরে থাক, ঠিকমতো ভাত খাইতে পারি না। বাজারে চালের কেজি ৭০ টাকা। আর আমাগো কামের মূল সারাদিনে ১২০ টাকা।’
ফেঞ্চুগঞ্জে আন্দোলনরত চা শ্রমিক নেতারা বলেন, চা-শ্রমিকেরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার অপেক্ষায় আছেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া শ্রমিকেরা আর কাউকে বিশ্বাস করেন না। শেখ হাসিনা যা বলবেন, শ্রমিকেরা মানবেন।